নায়িকাদের প্রযোজনার অর্থের উৎস কোথায়?

ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে উঠতি নায়িকারাই এখন সিনেমা নির্মাণে অর্থ লগ্নি করছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নিজের অভিনীত প্রথম ছবি মুক্তির আগেই প্রযোজক বনে যাচ্ছেন! আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবার থেকে না এলেও সিনেমায় অর্থলগ্নির নেপথ্যে অনেকের বেলায় রয়েছে ভিন্ন ইতিহাস। বিস্তারিত –

ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থার কথা যদি এখন কেউ কাউকে প্রশ্ন করেন, তবে কেউই তার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবেন না। কারণ সেই মূল্যায়নের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই আজকের ঢাকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। এই টালমাটাল অবস্থায় যখন এফডিসির প্রায় সব স্টুডিও বিভিন্ন চ্যানেলের নামের ভাড়া হয়ে যায় বছরব্যাপী- তখন যারা বলেন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দারুণ এক উন্নয়নের আশা দেখছেন, তারা যে বোকামির প্রলাপ আওড়ান, সেটা মেধাবীরা সবাই বোঝেন।

আজ যখন জাজ মাল্টিমিডিয়া নামের এক বিতর্কিত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের হাতে সিনেমা হলের প্রজেকশনের ক্ষমতা চলে যায় একচ্ছত্রভাবে, যখন তারা নিজেদের প্রযোজিত যে কোনো মানের ছবিই হল বুকিং করে নেয় অনায়াসেই, পাছে অন্য ভালো নির্মাতারা হল বুকিংয়ের সুযোগই পান না। কিংবা পেতে হলেও অনৈতিক চর্চার হাত বেয়ে পেতে হয়; ঠিক সে সময় কারও বলার সাধ্য থাকে না এ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন লালিত ছিল, এ ইন্ডাস্ট্রি জহির রায়হানের আশায় বুক বাঁধা উঠোন ছিল, এ ইন্ডাস্ট্রি আলমগীর কবির, খান আতাউর রহমানের দৃপ্ত হাতের হাতিয়ার ছিল। কারণ আজকের ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যে গভীর এক অনৈতিক পথে অন্ধকার কুড়াচ্ছে! খানিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

দীর্ঘদিন ধরে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে একটা কথা চাউর রয়েছে। নির্মাতার হাতে নাকি আর ইন্ডাস্ট্রি নেই! যা কিছু আছে সেটা এখন প্রযোজক বা লগ্নিকারীর হাতে চলে গেছে! এরপর শোনা গেল নির্মাতাদের নাকি শাকিব খান বা গুটিকতক প্রভাবশালী নায়কের কাছে হুজুর হুজুর করতে হয়। সময় বদলায়। কিন্তু সেই সময়টা এত অভিশপ্ত হয়ে বদলে যাবে কে জানত?

ইন্ডাস্ট্রির এ সংকটের চলমান দিনে আজ প্রযোজক বা নায়ক নন, খোদ নায়িকাদের কাছেই নিজের অস্তিত্ব যাচাই-বাছাই করতে হচ্ছে। তাও সেটা সিনিয়র কোনো নায়িকা হলে কথা ছিল না। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পী, কলা-কুশলীদের জন্য এর চেয়ে লজ্জার, অপমানের আর কি আছে? কারণ উঠতি নায়িকারা এখন ছবির লগ্নিকারী। সেই নায়িকা লেবাসধারী অনৈতিক লগ্নিকারীরা নাকি নায়ক বা নির্মাতাকে ভাড়া করছেন, নিজেদের পরিচয়ের শরীরে ‘নায়িকা’ তকমাটি স্থায়ী করার জন্য এটাই এখন অন্যতম উপায়।

বিশ্বের কম বেশি প্রায় সব দেশেই নায়িকারা প্রযোজক হয়েছেন বা হচ্ছেন। ইতালির মনিকা বেলুচি বা হলিউডের অ্যাঞ্জেলিনা জোলিরা ছবির প্রযোজক হন ছবির শেয়ার মানি হোল্ডার হিসেবে। আমাদের দেশে ‘প্রযোজক আর লগ্নিকারী স্বত্বা’ এই দুটি জিনিস যে আলাদা সেটাও বোঝার মতো ক্ষমতা নেই কারও! একজন প্রযোজক কখনও নিজের গাঁটের পয়সা ইনভেস্ট করেন না। কিন্তু প্রযোজক সব অর্থ জোগান দেন, তার ব্র্যান্ড ভ্যালুর খাতিরে। তার প্রভাবেই বা তার প্রতি আস্থা রেখেই লগ্নিকারীরা অর্থ বিনিয়োগ করেন।

অথচ অবাক করার মতো বিষয় হল আমাদের দেশে যারা প্রযোজক এবং লগ্নিকারী তারা সবাই নবাগত। তাও আবার তারা উঠতি নায়িকা। যাদের ক্যারিয়ারে এখনও কোনো অবস্থান তৈরি হয়নি! তাদের প্রতি ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে কোন মোহে আস্থা রাখছেন সেটাই প্রশ্ন সাপেক্ষ। কী তাদের অর্থের উৎস? এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই।

খানিক উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা স্পষ্ট করা যাক-

ববি : ক্যারিয়ার এখনও প্রতিষ্ঠা পায়নি তার। ছবি সুপারহিট তো দূরের কথা এখনও সেই অর্থে হিট ছবির তালিকাও নেই নিজের ক্যারিয়ারে। অথচ তিনি এখন প্রযোজক এবং লগ্নিকারী হিসেবে ঢাকঢোল পিটিয়ে মহরত করছেন নিজের ছবির। অর্থবিত্ত নেই ব্যক্তি কিংবা পারিবারিক জীবনে। এ যদি হয় অবস্থা, তবে প্রশ্ন থেকে যায় তার আয়ের উৎস কী? বা নিজের ব্র্যান্ড ভ্যালুর খবর? ব্র্যান্ড ভ্যালু বলতে নির্মাতা ইফতেখার চৌধুরীর সঙ্গে লিভ টুগেদার করেন, এটা সবার কাছেই নিরেট জলের মতো সত্য তথ্য ইন্ডাস্ট্রিতে। এর বাইরে তার কোনো ছবির সম্মানী কি ফিক্সড হয়েছে? বা কেউ জানেন? জানেন না! আর নিজের অভিনয় করা একটি ছবিতে কত টাকা সম্মানী পেলে, এরপর কতটি ছবি করলে এক কোটি টাকা (আনুমানিক) বাজেটের একটি ছবিতে বিনিয়োগ করা যায়? প্রশ্ন ওঠে, ববির আয়ের উৎস কী? ছবি প্রযোজনা করার জন্য এত অর্থ তিনি পেলেন কোথায়? প্রশ্ন যখন জবাবহীন হয়ে পড়ে, দুর্নীতি বা অনৈতিক চর্চা যখন তাদের গোড়ায় থাকে, তখন সেই প্রোডাকশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তো উঠবেই। ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ তো বটেই।

মিষ্টি জান্নাত : ক্যারিয়ারে এখনও ঠিক মতো কেউ জানেন না, তিনি আসলে কী? কোন পেশায় অবস্থান করেন? অথচ বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের একাধিক টকশো ও প্রিন্ট কিংবা অনলাইন গণমাধ্যমে বলেছেন অমুক অমুক ছবি করছেন। একটি নামকাওয়াস্তে ছবি রিলিজ হয়েছে, তাও মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি হলে। এর মধ্যেই তিনি একাধিক ছবির প্রযোজক বনে গেছেন। শুধু দেশে নয়, কলকাতার সঙ্গে ওখানকার নায়ক দেব, জিৎ, সোহমকে নিয়ে ছবি প্রযোজনার ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও বলে থাকেন, বাবার অর্থেই মিষ্টি জান্নাত সিনেমার লগ্নিকারী, দামি গাড়িতে চড়ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা কি এতটাই লাভজনক যে তার পৈতৃক অর্থ লগ্নি করে একাধিক ছবিতে বিনিয়োগ করা যায়? কিংবা বাবার কী পরিমাণ অলস বৈধ অর্থ পড়ে আছে, যেটা জলে ফেলে দিলে কোনো সমস্যা হবে না? মিষ্টি তাই নায়িকা সুলভ আচরণ নয়, বরং টিভি মিডিয়ার কবির তিথি বা ভাবনাসহ একাধিক উঠতি মডেল-অভিনেত্রীকে বলছেন, আমার পরের ছবিতে তোমাকে নেয়া যায় কি না ভাবছি। স্বভাবতই তার পারিবারিক অর্থের উৎসও প্রশ্ন সাপেক্ষ! এ ক্ষেত্রে ডিরেক্টরস মিডিয়ার সংজ্ঞা কোথায় হারায়? আর এ জলে অর্থ ফেলার মতো এতবড় লগ্নিকারীর টাকার উৎস কোথায়? একটু খোঁজ করলেই থলের কালো বিড়ালটা বেরিয়ে আসবে। আর যা অস্পষ্ট অর্থ তা কোনোদিনই সুফল বয়ে আনতে পারে না। এ কথা আমরা কে না জানি?

দিপালী : ক্যারিয়ার শুরু এটিএন বাংলার একটি চলচ্চিত্র দিয়ে। ছবির নাম ‘পায়রা’। সেই ছবিটির শুটিং হল, এডিটিং চলল কিন্তু মুক্তি মিলল না। তখন থেকে প্রচারিত, তিনি ছবির নায়িকা কাম প্রযোজক। অথচ তার আয়ের উৎস বা তার নির্দিষ্ট ব্যবসার খবর কেউ জানেন না। তিনিও পৈতৃক লগ্নি থেকে প্রযোজক হয়েছেন বলে জানান। অথচ সূত্র বলে ভিন্ন কথা। একাধিক ছবিতে লগ্নি করার মতো অর্থ তার বাবার নেই। অথচ তিনিই এখন ঢাকাই ছবির লগ্নিকারী হিসেবে নির্মাতা থেকে কাস্টিং সবই ঠিক করছেন। কিশোর নামের এক রিয়েলিটি শো গায়কের সঙ্গে তার প্রেম এবং লিভ টুগেদারের গুঞ্জনও এখন ইন্ডাস্ট্রিতে খোলামেলা আলোচনা। এ প্রেমিক তার উপার্জিত সব অর্থই প্রেমিকার ছবির পেছনে ঢেলে দিয়েছেন বলেও গুজব রয়েছে। এমন অনৈতিক আর বেপরোয়া জীবনের বাসিন্দা দিপালীই এখন ছবির লগ্নিকারী। প্রশ্নের পর প্রশ্ন আছে যাদের অর্থের উৎস নিয়ে, কিন্তু জবাব নেই!

লাবন্য লী : নিজের ক্যারিয়ারে এখনও ‘চিত্রনায়িকা’ শব্দটি যোগ হয়নি তার। অথচ তিনিই তার প্রথম ছবির প্রযোজক ও লগ্নিকারী! উপস্থাপক (আরজে) নীরব খানের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক বা নানা প্রেমালাপের বাহাস ফেসবুকে প্রতিদিনই কারও না কারও ইনবক্সে চালাচালি হয়। লাবন্য লী এখন নির্মাতা রয়েল খানকে নিয়ে একটি ছবি নির্মাণ করছেন। হ্যাঁ, নবাগত নায়িকারাই যখন প্রযোজক বা লগ্নিকারী হয়ে বসেন তখন তো এটা বলাটাই স্বাভাবিক যে, লী-ই এখন নির্মাতা রয়েল খানকে ভাড়া করেছেন। ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ালে ঢাকাই চলচ্চিত্রের এমন জীর্ণদশা হওয়া সম্ভব, সেটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই।

তানহা মৌমাছি : এ চিত্রনায়িকার এটি পোশাকি নাম। তবে চরিত্রগত অবস্থানে মৌমাছির মতোই আচরণ বটে! কারণ খোদ যিনি তাকে ফিল্মে আনার প্রধান সহযোগী ছিলেন, সেই অভিনেতা প্রযোজক ফিরোজ শাহী নিজেই বলেছেন তার সম্পর্কে। যে ঢাকা শহরে তানহা মৌমাছির একটি থাকার জায়গাও ছিল না। ভাড়া বাসায় জীর্ণ অবস্থায় কাটত দিনরাত। অথচ কোনো ছবি রিলিজের আগেই এখন জিপ হাঁকাচ্ছেন! ‘এই গল্পে ভালোবাসা নেই’ নামের একটি ছবির শুটিংকালীন ফিরোজ শাহীর পরিচিত এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে মৌমাছির। অতঃপর সেই বিবাহিত ব্যবসায়ীর সঙ্গে প্রেম অভিসারে তার রক্ষিতা বনে গেলেন। আর আলাদীনের চেরাগের মতোই হাতে চলে এলো অগুণতি অর্থ। খোদ যিনি তানহাকে চলচ্চিত্রে আনলেন, সেই ফিরোজকেই তানহা মৌমাছি চ্যালেঞ্জ করছেন, ছবিটির প্রযোজক হিসেবে তার নাম জুড়ে দেয়ার জন্য। সেটা যত অংকই হোক, নয়তো টাকা ছাড়াই অন্য ক্ষমতা বলেও নাকি ফিরোজ শাহীর কাছ থেকে ছবিটি কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা তার রয়েছে! তাই মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন!

পরীমনি : এটিও পোশাকি নাম। বিতর্ক কাকে বলে ও কত প্রকার এবং কী কী- তা এ মেয়েটির স্বল্প দিনের ক্যারিয়ার ঘাঁটলেই বোঝা যায়। আজ অব্দি হাতেগোনা কয়েকটি ছবি রিলিজ হয়েছে মাত্র। এখনও হিট তো দূরের কথা, ছবি ফ্লপ বলতে যা যা অর্জন করতে হয়, সেটিও অর্জিত হয়নি তার ছবিতে। অথচ তাকে ছবিতে কাস্ট করলেই বিশেষ লগ্নিকারী অর্থ জোগান দেন। অস্পষ্ট প্রযোজক হিসেবেই থাকেন পরী! কোটি টাকার ফ্ল্যাট-গাড়ি নিয়ে সত্যিকার অর্থেই বলিউডের ‘ডার্টি পিকচার’-এর ‘সিল্ক’-এর জীবন যাপিত করছেন। আর এত অর্থের উৎস আপনি কী করে মেলাবেন। তা যে কোনো সৎ ব্যবসায়ী বা বিশ্বের সেরা গণিতবিদেরাও হার মানবেন!

ইন্ডাস্ট্রির এ অনৈতিক আর অশুদ্ধ চর্চায় চলচ্চিত্র সমাজের উন্নয়ন তা আশার গুড়ে বালি। তারা নিন্দিত হচ্ছেন সমাজে কেউ কেউ, কিন্তু কোনো মিডিয়া প্রকাশ না করায় নব্য নির্মাতা, উঠতি হিরো, বা স্ট্রাগলার হিরোরা এসব উঠতি নবাগত কাম প্রডিউসারদের তোষামোদিতে ব্যস্ত থাকছেন। কোনো ছবির কাস্টিং থেকে শুরু করে মিউজিক ডিরেক্টর, ছবির নির্মাতাকে বলেন ‘প্লিজ আপনি একটু ম্যাডামকে অনুরোধ করেন, তারপর আমি সুপারিশ করব।’

বিশ্বের উন্নত দেশে যখন প্রযোজকরা থাকছেন সবচেয়ে মেধাবী, সবচেয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক বা কোনো সিনিয়র নায়িকা। সেখানে আমাদের দেশে একের পর এক নব্য প্রযোজক, শরীরি বা অশরীরি লগ্নিকারীর জন্ম হচ্ছে নানা অনৈতিক রেকর্ডের বেড়াজালে। তাদের কাছ থেকে ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন কতটা প্রত্যাশা করবেন, কারা করবেন তা বোঝাই যায়। তবে মৌসুমি হাওয়ার মতোই এরা টিকবে না নিশ্চয়ই। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিকে নোংরা আর অসভ্যতার কাছে যে ঠেলে দেবে, সেই নোংরা, নর্দমা পরিষ্কার করতেও তো আগামী প্রজন্মের সময় লেগে যাবে। ততদিনে আমরা কতদূর পেছাব, কতটা অন্ধকারে গড়াবে আমাদের সেলুলয়েডের আলো কে জানে? কে জানে?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s