জ্যামিতিক গুহাচিত্রগুলো ভাষার লিখিত রূপের আদিম প্রমাণ!

যুগ যুগ ধরে পুরাতত্ত্ববিদরা পাথর বা গুহায় প্রাচীনকালে আঁকানো ছবি খুঁজতে ছুটেছেন। বরফ যুগের সময়কার মানুষের আঁকা ঘোড়া বা বাইসনের ছবি মিলেছে ইউরোপের বিভিন্ন গুহায়। তবে অল্প কিছু বিজ্ঞানী দৃষ্টি দিয়েছেন সূক্ষ্ম জ্যামিতিক আঁকিবুকির দিকে। অনেকের কাছে তা সেই সময়কার শিল্পচর্চা। আবার অনেকে মনে করেন, এগুলোর মাধ্যমে বিশেষ অর্থ প্রকাশ করা হয়েছে। অবশ্য অনেকের মতে, এগুলো স্রেফ সৌন্দর্য বর্ধনের নকশা।

তবে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ভিক্টোরিয়ার পিএইচডি শিক্ষার্থী ও প্যালিওনথ্রোপলজিস্ট জেনেভিনে ভন পেটজিনজার নতুনভাবে এই জ্যামিতিক নকশার ব্যাখ্যা করছেন। ‘দ্য ফার্স্ট সাইনস’ বইয়ে তিনি লিখেছেন, বরফ যুগের ইউরোপিয়ানরা ৩২টি বিশেষ অর্থপূর্ণ নকশা ব্যবহার করতেন ভাষার আদান-প্রদানে। এর ব্যবহার চলে প্রায় ৩০ হাজার বছর ধরে। এই গবেষক ব্লেচলে পার্কের নাতনী। ব্লেচলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোডব্রেকার নামে পরিচিতি পান। সেই সুবাদেই তার নিভিন্ন নকশার পাঠোদ্ধারের আগ্রহ জন্মে। প্রাচীনকালে পাথরের আঁকিবুকি তাকে আকর্ষণ করতো।

তার গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায়। তার মতে, বরফ যুগে ইউরোপিয়ানরা কয়েক ধরনের নকশার মাধ্যমে অর্থ প্রকাশ করতেন। এর সঙ্গে নতুন নতুন অর্থপূর্ণ নকশার জন্ম হতে থাকে। তিনি উত্তর স্পেন থেকে শুরু করে রাশিয়ার উরাল মাউন্টেন অঞ্চলে ৩৬৭টি প্যালিওলিথিক পাথের গায়ে আঁকা চিত্র নিয়ে গবেষণা করেছেন।

এসব চিত্র নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার কাজে তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করে নিজস্ব ফটোগ্রাফারকে সঙ্গে নিয়ে। এই ক্যামেরাম্যান তারই স্বামী ডিলিয়ন ভন পেটজিনজার। তারা দুজন মিলে ৫২টি গুহা ভ্রমণ করে যেখানে খুব যাওয়া হয়েছে। টানা দুই সপ্তাহ তারা গুহা থেকে গুহাতে গুরেছেন।

আপার প্যালিওলিথিক সময়ের এসব গুহায় ঘুরে তিনি দেখেছেন, মোট ৩২টি নকশার ব্যবহার ঘটেছে। পূর্বপুরুষরা এসব জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার করতেন। গোটা ইউরোপে এই নকশাগুলোর প্রচলন ছিল।

তাহলে এসব নকশার অর্থ কি ছিল? স্পেনের এমনই এক গুহা লা পাসিগা। সেখানে কেভ-আর্ট গবেষকরা বরফ যুগের ১২ ফুট লম্বা এক বিরল নকশা আবিষ্কার করেছেন। এগুলো বিভিন্ন ছোট ছোট তথ্যের সমন্বয়। এই নকশাগুলোই সেই সময়কার লেখার রীতির প্রমাণ দেয়। এগুলোই মানুষের আদি লেখ্যরীতি।

গবেষকরা বলেন, এই চিত্রকলা আসলে তাদের মুখের ভাষার লেখ্যরূপ। তবে ইউরোপের গুহাচিত্রে এমন জ্যামিতিক অঙ্কন দেখা যায় না। কাজেই বরফ যুগের এসব চিত্রকলা কোনভাবেই অর্থহীন নয়। পর্তুগালের কোয়া ভ্যালি অঞ্চলের একটি গুহায় তারা একটি চিত্রকলায় বিশে আঁকাবাঁকা রেখা দেখতে পান। এগুলো হয়তো কোনো নদী বা মানচিত্রের অংশ তুলে ধরা হয়েছে।

তার এই নতুন গবেষণাকে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আমেরিকান মিউজিয়াম অব নেচারাল হিস্ট্রির কিউরেটর এবং প্যালিয়নথ্রোপলজিস্ট ইয়ান টাটারসাল। বিমূর্ত এসব নকশা যে নতুন অর্থ প্রকাশ করছে তা দারুণ উত্তেজনাকর। কিছু অবহেলিত ও অজানা অংশে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি করবে ভন পেটজিনজারের গবেষণা।

এ গবেষণাখাতে নতুন করে আরো বহু পুরাতত্ত্ববিদকে আশা করেন। তাদের সম্মিলিত গবেষণায় নিঃসন্দেহে প্রাচীন সভ্যতার নতুন সব ইতিহাস বেরিয়ে আসবে। লৈখিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এগুলোই আদি প্রমাণ। এর মাধ্যমেই লেখ্যরূপের সৃষ্টি ও তা বিকশিত হতে থাকে। সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফি

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s