এফডিসিতে কমে যাচ্ছে শুটিং

এফডিসির ভেতরের রাস্তায় রাস্তায় ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা উৎসুক মানুষের জটলা এখন তেমন একটা চোখে পড়ে না; কিংবা ফ্লোরগুলোর পাশ দিয়ে পার হওয়ার সময় ভেতর থেকে মারপিটের ঢিসুম ঢিসুম শব্দ, কিংবা সিনেমার শেষ দৃশ্যের কান্নার রোল কানে আসে না রোজ। ঝরনা স্পটের পানিও আগের মতো ঝরে না তেমনটা। সুইমিং পুলের চিরচেনা সেতুটিও নতুন নতুন গানের সঙ্গে সাজে না নিয়মিত। হ্যাঁ, সিনেমা তৈরির এই কারখানায় এখন আর সিনেমার শুটিং-বাতি জ্বলে না প্রতিদিন। অর্ধদশকে এফডিসির চিত্রটা অনেকখানিই পাল্টেছে।
১৯৭৫ সাল থেকে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত চলচ্চিত্র পরিচালক মালেক আফসারি। তিনি বলেন, ‘এখন তো ছবিই কম নির্মাণ হচ্ছে। যা নির্মাণ হচ্ছে, তাতে যে বাজেট, সেই বাজেটে এফডিসির খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করা কঠিন।’
তাঁর ভাষায়, বাইরে থেকে লাইট, ক্যামেরা ডাবিং, এডিটিংয়ের প্যাকেজ নিয়ে শুটিং করলে এফডিসির খরচের অর্ধেক পড়ে।
২০০০ সালের পরেও এফডিসির বিভিন্ন ফ্লোর, চত্বর মিলে একই দিনে একই সঙ্গে ১০ থেকে ১৫টি ছবির শুটিং হয়েছে। একটা সময় এসে সেই সংখ্যা কমতে থাকে। বর্তমান সময়ে এমনও হয়, সপ্তাহে এফডিসিতে দু-একটা ছবির শুটিং হয়, কোনো কোনো সময় তা-ও হয় না।
গত এক মাসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বড়জোর ৮ থেকে ১০ দিন সিনেমার শুটিংয়ের বাতি জ্বলেছে এফডিসির ফ্লোরগুলোতে। তাহলে বাকি দিনগুলোতে কি বসে ছিল ফ্লোরগুলো?
এফডিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা হিমাদ্রি বড়ুয়া বলেন, ‘না। বিভিন্ন টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন শুটিংয়ের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছিল।’
আর এভাবেই টেলিভিশন অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে দখল হয়ে যাচ্ছে এফডিসির আঙিনা।
এফডিসি সূত্রে জানা গেছে, এফডিসির মোট নয়টি ফ্লোরের মধ্যে পাঁচটি এখন বিভিন্ন টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের শুটিংয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
৯ নম্বর স্টুডিওটি প্রায় এক বছর ধরে এশিয়ান টেলিভিশন ব্যবহার করছে। ৮ নম্বর ফ্লোরটি এটিএন বাংলা ব্যবহার করছে প্রায় দুই বছর ধরে। আরও দুই বছরের জন্য বরাদ্দ নেওয়ার কথা। নতুন করে দুই মাসের জন্য ৪ নম্বর ফ্লোরটি বরাদ্দ নিয়েছে এনটিভি। বাংলাভিশন ১৫ দিনের জন্য বরাদ্দ নিয়েছে ৩ নম্বর ফ্লোরটি। ২ নম্বর ফ্লোর ১১ দিনের জন্য বরাদ্দ গান বাংলার জন্য।
সিনেমার সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, এফডিসিতে শুটিং খরচ বেশি। এখন বছরেই ৬০-৭০টা ছবি নির্মাণ হয়। বেশির ভাগ ছবিরই বাজেট কম। তাও মুক্তির পর টাকা উঠে আসছে না। তাই অনেক পরিচালকই খরচ বাঁচাতে এফডিসির বাইরে শুটিং করছেন।
তাঁদের কথা, প্রতিবছরই ফ্লোর ভাড়া বাড়ে। অধিক ভাড়ার কারণে যখন সিনেমার শুটিং বাইরে চলে যাচ্ছে, ঠিক তখনই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ফ্লোরগুলো টেলিভিশনের দখলে চলে যাচ্ছে। চ্যানেলগুলোর কাছে খরচটা বড় বিষয় নয়। কারণ বড় বড় প্রতিষ্ঠানের স্পন্সর নিয়ে অনুষ্ঠানগুলো তৈরি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে চলচ্চিত্রের আরেক পরিচালক ওয়াকিল আহমেদ বলেন, ‘শুটিংয়ের জন্য এফডিসির ফ্লোরের দরজা খুললেই টাকা খরচ শুরু হয়ে যায়। শিফটের জন্য বরাদ্দের সময় এক ঘণ্টা বেশি হলেই ফ্লোর থেকে শুরু করে লাইট, ক্যামেরা, সঙ্গে টেকনিক্যাল ক্রুদেরও এক শিফটের বাড়তি ভাড়া দিতে হয়। কিন্তু বাইরে শুটিংয়ের সময় এই ঝামেলা নেই।’
তাঁর ভাষ্য, বেশি ভাড়ার কারণে যখন এফডিসিতে শুটিং কমে যাচ্ছে, তখন সিনেমার জন্য নির্ধারিত ভাড়া থেকে আরও ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে বিভিন্ন চ্যানেলের কাছে ফ্লোরগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। বাড়তি আয়ই এখন এফডিসির কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এফডিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘শুটিং না থাকলে ফ্লোর পড়ে থাকে। পড়ে থাকা ফ্লোর যদি চ্যানেলের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়, তাহলে সমস্য কোথায়?’
কিন্তু বেশি ভাড়ার কারণেই তো পরিচালকেরা এফডিসিতে শুটিং করছেন না—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সরকার তো এমনিতেই ভর্তুকি দিচ্ছে। এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারকে বছরে বড় অঙ্কের খরচ বহন করতে হয়।’
তবে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন কুমার ঘোষ বলেন, ‘গত বছরের আগস্ট মাস থেকে ফ্লোরগুলোর আগেকার ভাড়া থেকে শতকরা প্রায় ১০ ভাগ করে ভাড়া কমিয়েছি। এরপরও যদি সিনেমার শুটিং না করা হয় তাহলে তো ফ্লোরগুলো অন্য কোথাও ভাড়া দিতে হবে। এটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। আয়ও তো দরকার।’
চ্যানেলগুলোর কাছে ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দুটি চ্যানেলের কাছে দুটি ফ্লোর ভাড়া দেওয়া আছে। তবে আমাদের ভাবনা আগে সিনেমা, তারপর বাইরে ভাড়া দেওয়া।’
যদি সিনেমার শুটিংয়ের জন্য হঠাৎ করেই ওই ফ্লোর দুটির দরকার হয়, তাহলে চ্যানেলের ভাড়া বাতিল করে সিনেমার জন্য বরাদ্দ দেওয়া যাবে কি? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, নির্ধারিত সময় শেষ না হলে বরাদ্দ বাতিল করে অন্য কোথাও ভাড়া দেওয়া যাবে না।
এ ব্যাপারে পরিচালক ওয়াকিল আহমেদ বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের কথায় তো বোঝা গেল সিনেমার শুটিং আগে নাকি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের শুটিং।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বর্তমান সময়ে সিনেমাশিল্পকে বাঁচানোর তাগিদ কারও মধ্যে খুব একটা দেখছি না।’
ফ্লোর ভাড়া কমানোর কথা বলা হলেও তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ। প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক খোরশেদ আলম খসরু বলেন, ‘চলচ্চিত্রের এই মহা মন্দাবস্থার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি আনতে ফ্লোর ভাড়া যা আছে, তার ঠিক অর্ধেক করে দিতে হবে। তাতে করে এফডিসিতে সিনেমার শুটিংও বাড়বে, প্রযোজকদের ছবি তৈরির বাজেটও আয়ত্তের মধ্যে থাকবে।’

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s