নারীরা পুরুষদের ব্যাপারে বাস্তবে যা ভাবেন

চলতি মাসে সিনসিনাট্টিতে নির্বাচন পরবর্তী বিজয় উদযাপনের শুরুতে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুরুষদের উদ্দেশ্যে কাঠখোট্টা ভাষায় বলেছিলেন, “আপনাদেরকে বলতে ঘৃণা হচ্ছে, কিন্তু নারীরা তোমাদের চেয়ে ভালো”।
কিন্তু একজন নারীবাদি নারী হিসেবে আমি এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করি।

যুক্তরাষ্ট্রের সব নারীরা হিলারি ক্লিনটনকে প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং সংখ্যালঘু শেতাঙ্গ নারীদের একটি বড় অংশ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শেতাঙ্গ নারী ভোটারদের ৫৩ শতাংশই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। আমি এই নারীদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। এরা পুরুষদের নিয়ে অত বেশি ভাবেন না। এমনকি নিজেদের স্বামীদের নিয়েও না। আর এ কারণেই হয়তো তারা পুরুষদেরকেই প্রেসিডেন্ট বানান।
ট্রাম্পের সমর্থকরা লিঙ্গ বৈষম্যের বিষয়টি সাধারণত স্বীকার করতে চান না। কিন্তু ইস্টলেক, ওহিওর ৭৪ বছর বয়সী ট্রাম্প সমর্থক এক নারী বলেন, তারা চায়না একজন নারী প্রেসিডেন্ট হোক। তারা চায়না কোনো নারী রাষ্ট্র চালানোর দায়িত্ব পাক। চোখের গোলাপি ভ্রুগুলো নাচিয়ে তিনি বলেছিলেন, এখন আমিও জানি তুমিও জান যে এটা সত্যি।
পুর্ব স্ট্রাউডসবার্গের এক মধ্যবয়সী শেতাঙ্গ নারী যিনি ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন তিনি বলেন, ট্রাম্প একজন স্বকামী বা আত্মরতিপ্রবণ পুরুষ। আমি জানি কারণ আমার স্বামীও সেরকমই একজন। ” অথচ তিনি ট্রাম্পকেই ভোট দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ২৪০ বছরের ইতিহাসে মাত্র আটজন প্রেসিডেন্ট ছাড়া বাকী সকলেই ছিলেন শেতাঙ্গ পুরুষ। এবার সে ইতিহাস ভাঙ্গার একটি অপূর্ব সুযোগ আসার পরও তা আর ঘটল না।
তবে দুনিয়াব্যাপী এখন নারীদের ক্ষমতা বেড়ে চলায় পুরুষরা গভীরভাবে হুমকিতে পড়ে যাচ্ছে। পুরুষদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে নারীবাদিদের সমালোচনাকে দীর্ঘদিন ধরেই পুরুষ বিদ্বেষ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে আসছে। কিন্তু নারীবাদিদের লড়াইটা আবার এই বিশ্বাসেই অনু্প্রাণিত যে, পুরুষদের অবস্থা আরো ভালো হতে পারে যদি নারীরা তা হতে দেন। নারীরা সমঅধিকার পেলে পুরুষরা আরো নিরাপদ, আরো সমঅধিকারপূর্ণ এবং নায্য বিশ্ব থেকে উপকৃত হবেন। তবে নারীদের এখনো শুধু চেষ্টা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কারণ পুরুষরা এখনো সবকিছুই অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ করেন। আর নারীদের অনেকেও এখনো তাদের ভালোবাসেন।
আর নারীদের অন্তরঙ্গ জীবন, যেখানে তারা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত এবং সবচেয়ে কম যৌক্তিক তার সঙ্গে রাজনীতির সমন্বয় সাধন সবচেয়ে কঠিন কাজ। এছাড়া মাত্র দুই প্রজন্ম আগে নারী-পুরুষের সমতার ধারণা এসেছে। এখনো শুধু একসঙ্গে চলতে গিয়েই এই সমতার ধারণা অনেকে মেনে নিচ্ছেন।
২০০৫ সালে তৃতীয় বিয়ে করার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, “অনেক নারী আছেন যারা ভাবেন তাদের স্বামী তাদের সঙ্গে স্ত্রীর মতো আচরণ করবেন। আবার অনেক পুরুষও আছেন যারা এটা মেনে নেন। কিন্তু আমি এমন স্বামী নই। আমি শুধু অর্থ সরবরাহ করব আর আমার স্ত্রী আমার সন্তানদের দেখভাল করবেন। ”
ট্রাম্পকে সবেচেয়ে বেশি ভোট দিয়েছেন কলেজ পাশ করতে পারেননি এমন লোকেরা। ২০১৩ সালে পিউ রিসার্চ এর একটি জরিপে দেখা গেছে, কলেজ শিক্ষিতদের বেশিরভাগই বলেছেন, স্বামী যদি বেশি অর্থ আয় করেন তাহলেই দাম্পত্য সম্পর্ক সুন্দর হবে।
শেতাঙ্গ নারীদের বেশিরভাগই যদি ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে থাকেন তাহলে এর কারণ হয়তো তারা সমাজের সবচেয়ে সম্পদশালী এবং ক্ষমতাবান পুরুষদের সঙ্গেই গাটছড়া বাঁধতে চান।
বিপরীতে কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা সবচেয়ে বেশি ভোট দিয়েছেন হিলারিকে। এদের ১৪ শতাংশই নিজেদেরকে নেতা হিসেবে দেখতে আগ্রহী। আর এদের ২৩ শতাংশ ঘরের প্রধান উপার্জনকারী। সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমস/সিবিএস নিউজ পরিচালিত এক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। এই নারীদের জীবন দরকার বা স্বেচ্ছা পছন্দের কারণেই হোক ইতিমধ্যেই এই বিষয়টাকে অসত্য প্রমাণ করে দিয়েছে যে, পুরুষদের কাজ হলো শুধু অর্থ সরবরাহ করা; এর বেশি কিছু নয়।
মি. ট্রাম্প বিবাহিত নারীদের মনও জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। যাদের জন্য তাদের জীবনের পুরুষটিকে চ্যালেঞ্জ করা হয়তো অনেক বেশি কঠিন হবে। হিলারিকে ভোট দেওয়া টেক্সাসের ৫০ বছর বয়সী এক পত্রিকা বাহক বলেন, তার মা এবং অন্যান্য শেতাঙ্গ নারীরা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। কারণ, “ওই যে হিলারি আসছেন, তিনি একজন শক্ত নারী। আর বিষয়টি অনেক পুরুষকেই পাগল বানিয়ে দেয়। আবার অনেক নারীকে বিষয়টি বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। এই নারীরা তাদের ঘরে শান্তি বজায় রাখতে চান। ”
কিন্তু সর্বোচ্চ স্থানে প্রকাশ্য ইচ্ছাপত্র হলো এই ধারণা, এমনকি ক্ষমতাবান পুরুষরাও নারীদেরকে অংশীদার হিসেবে দেখতে সক্ষম এবং সন্তান লালন-পালনের আনন্দ নিতে পারেন। আবার একাধিক নারীকে নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত একজন এখন হোয়াইট হাউসে আসীন।
বারাক ওবামা নিজেকে একজন নারীবাদি হিসেবেই পরিচয় দিয়ে থাকেন। এমনকি সম্প্রতি তিনি ঘরে নিজের কম দায়িত্ব পালনের ব্যাপারেও আক্ষেপ করেছেন। ওবামা বলেন, তিনি ঠিক মতো সময় দিতে না পারায় তার স্ত্রী মিশেল ওবামাকেই বেশি দায়িত্ব পালন করতে হত।
তবে, পুরুষরা দায়িত্ব গ্রহণ করতে শুরু করেছে। এমনকি এর ফলে আমরা নারীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি ভিন্ন একটি বিশ্ব সম্ভব। এমন একটি বিশ্ব যেখানে নারীদের শ্রেষ্ঠত্বকে আমরা অতি কাল্পনিক করে তুলব না। যেখানে পুরুষদেরকে কর্তৃত্বের আসন থেকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হবে না।
আগামী বছর একজন পুরষকে বিয়ে করতে যাওয়া একজন নারী হিসেবে আমার বিশ্বাস এমন একটি বিশ্বের অস্তিত্ব থাকতে পারে। আমি মনে করিনা আমাদের দুজনের একজনও লিঙ্গের ভিন্নতার কারণে পরস্পর থেকে বেশি ভালো বা খারাপ। আমরা হলাম গিয়ে দুজন মানুষ যারা পরস্পরের সঙ্গে একত্রে থাকলে ভালো কিছু হবে বলেই আশা করি। আমি জানি আমি ভাগ্যবান। আমি যদি ভাবতাম সকল পুরুষই মি. ট্রাম্পের মতো বা সুযোগ পেলে মি. ট্রাম্পের মতো হয়ে উঠতে পারে তাহলে কে জানে আমি কী করতাম।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s