ঢাকাই চলচ্চিত্রে পোস্টার নকলের মহোৎসব

‘নকল’ শব্দটি ঢাকাই ছবির জন্য একটি হতাশার নাম। যে শব্দটির আপাদমস্তক ব্যবহারে সম্ভাবনাময়ী এ চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুধু মেধাহীনই করে দেয়নি, শিল্পটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তেও এনে দাঁড় করিয়েছে।

ঢাকাই চলচ্চিত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ছবির গল্প, সংলাপ, দৃশ্য, গানের সুর এসব নকলের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। অনেক আগে থেকেই মৌলিক সৃজনশীলতার জায়গা থেকে সরে এসে এ ধরনের নকলের বিষয়টি সমালোচনার জন্ম দিয়ে আসছে।

সমালোচনা হলেও কোনো কাজেই আসেনি তা। বরং ক্রমেই নকলের ক্ষেত্র বেড়েছে। গল্প, গান, দৃশ্যাবলী নকলেরও পাশাপাশি এবার নতুন করে নকলের খাতায় সংযোজন হয়েছে হুবহু পোস্টার! এ নকলের অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছেন দেশের থার্ড গ্রেডের নির্মাতা থেকে শুরু করে প্রথম সারির চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ছবির পোস্টারও।

বিষয়টি নিয়ে দেশের সিনেমা বোদ্ধা ও সাংবাদিকরা নিয়মিত সমালোচনা করলেও তাতে কর্ণপাত করছেন না কেউই। যদিও প্রতিটি ছবির পাশাপাশি পোস্টারও সেন্সর বোর্ড থেকে পাস করিয়ে নিতে হয়। কিন্তু সেন্সর বোর্ডের উদাসীনতায় নকল ছবির পাশাপাশি নকল পোস্টারও ছাড়পত্র পেয়ে যাচ্ছে নির্দ্বিধায়।

প্রশ্ন জাগে, সেন্সর বোর্ড সজাগ থাকলেও কী থামানো যেত বিষয়টি? উত্তর হচ্ছে, অনেকাংশে ‘না’। কারণ নৈতিকতা আর মৌলিক সৃষ্টিশীলতা জলাঞ্জলি দিয়ে যারা শুধু অর্থ আয়ের পেছনে ছোটেন তাদের কাছে এমনটি কোনো অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য নয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, চলচ্চিত্রের সেন্সর বোর্ড থাকলেও এ বোর্ড কতটা নৈতিকতার সঙ্গে কাজ করছে? ক্রমাগত নকল ছবি অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাচ্ছেতাই ছবি বানিয়ে আনকাট অনুমোদন নিয়ে নিচ্ছেন অনেক প্রযোজনা সংস্থা। মাঝে মাঝে দু-একটি ছবির ক্ষেত্রে সেন্সর বোর্ডের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখা গেলেও তাতে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতেই দেখা যায় বেশি। তাই নকল পোস্টার ধরার বিশেষ কোনো বোর্ড থাকলেও তাতে কোনো কাজে আসত বলে মনে হয় না। দেখা যেত, হলিউড কিংবা বলিউডের কোনো পোস্টারের থিম চুরি করে দিব্যি পার পেয়ে যেতেন আইডিয়া চোরেরা!

পোস্টার নকলের অভিযোগ আগেও ছিল। তবে এখনকার মতো এতটা জেঁকে বসেছিল না। এতটা হুবহু নকলের অভিযোগও তখন ছিল না। আইডিয়া কিঞ্চিত ধার করার অভিযোগ উঠত মাত্র। তবে এখন যেটা হচ্ছে সেটাকে শুধু পোস্টারের আইডিয়া চুরি নয়, জোচ্চুরি বলেই অভিহিত করছেন গুণীরা। এ চুরির মধ্যে আরও ভয়ংকর খবর হচ্ছে শুধু পোস্টারের আইডিয়াই চুরি নয়, বিদেশী ছবির পোস্টারের নায়ক-নায়িকাদের মাথা কেটে দেশীয় নায়ক-নায়িকাদের মাথা বসিয়ে দেয়ার বিষয়টিও। যা শুনতেও কেমন লজ্জাবোধ হয়!

এই তো গত বছরের শেষের কথা। শফিক হাসান পরিচালিত ‘ধূমকেতু’ ছবির প্রকাশিত পোস্টারে দেখা গেছে এমনটি। ভারতের দক্ষিণের একটি ছবির পোস্টার নকল করা হয়েছিল। ওই ছবির নায়িকা কাজল আগারওয়ালের শরীর ঠিক রেখে কেবল মুখটা বসিয়ে দিয়েছেন ঢাকাই ছবির আলোচিত-নায়িকা পরীমনির।

ছবিটি প্রকাশের পরই সমালোচনা চলছে। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে পরিচালক শফিক হাসানের সৃজনশীলতার। কারণ পোস্টারটি তিনি নিজেই প্রকাশ করেছেন।

বিষয়টি টের পেয়ে পরীমনিও সিনেমাটির প্রযোজক-পরিচালকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। অবশ্য ওই বছর এটিই কেবল প্রথম হুবহু পোস্টার নকলের নজির নয়!

একই বছর মুক্তি পাওয়া ফিরোজ খান প্রিন্স পরিচালিত ‘মাস্তানি’ ছবিতে নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মৌসুমী হামিদ। সেখানে দেখা গিয়েছিল কানাডিয়ান পর্নো অভিনেত্রী সানি লিওনের ছবিতে তার শরীরের ওপর মৌসুমী হামিদের মাথা বসিয়ে দেয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে পরিচালকের সঙ্গে মনোমালিন্য হতেও দেখা গেছে নায়িকা মৌসুমী হামিদের। পাশাপাশি একই ছবির একটি পোস্টারে কালো ও লালের মিশেলে পোশাক পরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় মারুফকে। যার সঙ্গে হুবহু মিল পাওয়া যায় ২০১০ সালের তেলেগু সিনেমা ‘নাগাবাল্লি’ ছবির পোস্টারের।

একই বছরের ৬ মে মুক্তি পায় অনন্য মামুনের ‘ছবিটি’। শুরু থেকেই মৌলিকত্বের বেশ হাঁকডাক পেটানো হয়েছিল ছবিটি নিয়ে। কালোর্স সালেহ প্রযোজিত ছবিটিতে দেখা গেছে বলিউডের ‘কৃষ’ ছবির পোস্টার থেকে ঋত্বিকের গলা কেটে তাতে বসানো হয়েছে ছবিটির নায়ক আরিফিন শুভর মাথা।

এ ছাড়া একই সময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত গুণী নির্মাতা জাকির হোসেন রাজুর ছবি ‘নিয়তি’। এতেও পোস্টার নকলের অভিযোগ ওঠে। ছবিটির প্রকাশিত দুটি পোস্টারের মধ্যে একটি ছিল হিন্দি ‘চালো ড্রাইভার’-এর অন্যটি একটি কোরিয়ান সিনেমার পোস্টারের আদলে।

এত গেল এফডিসিকেন্দ্রিক ছবিগুলোর পোস্টারের কথা। এ ছাড়া এ অঙ্গনে যারা অগাধ জ্ঞানের পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত তাদের কিছুটা ব্যতিক্রম ধারার ছবির পোস্টারের বেলায়ও দেখা গেছে নকলের ছড়াছড়ি। তবে তাদের নকলটা গলা কাটা ছবির মতো এতটা সহজ ছিল না। কিছুটা সুনিপুণভাবেই নকলের এ কাজ সিদ্ধি করতে চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু ভার্চুয়ালে বিচরণ করা এখনকার দর্শক এতটা বোকা নয়। তারা ঠিকই ধরে ফেলেছে তাদের শৈল্পিক পোস্টার তৈরির কারিশমা।

এর মধ্যে ছিল রেদওয়ান রনির ‘আইসক্রিম’ ছবিটির পোস্টার। এ ছবির পোস্টার ক্যারি গ্র্যান্ট, ক্যাথরিন হেপর্বান ও জেমস স্টুয়ার্টের সিনেমা ‘দ্য ফিলাডেলফিয়া স্টোরি’ এবং বলিউডের সালমান খান, রানি মুখার্জি ও আরবাজ খান অভিনীত ‘হ্যালো ব্রাদার’-এর পোস্টারের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। তবে বিষয়টিকে নকল বলে মানতে নারাজ নির্মাতা।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “আমি যখন ‘আইসক্রিম’ সিনেমার পোস্টারের জন্য ফটোশুট করছিলাম তখন আমার মাথায় ছিল না ‘আইসক্রিম’ সিনেমার পোস্টারটি কোনো সিনেমার পোস্টারের সঙ্গে মিলবে, নাকি মিলবে না। ‘আইসক্রিম’ প্রেমের সিনেমা। প্রেমের সিনেমার পোস্টার অনেক ধরনের হতে পারে। প্রেমের সিনেমার পোস্টারে নায়ক-নায়িকা আলিঙ্গন করছে, সারা বিশ্বে এমন কয়েক লাখ পোস্টার পাওয়া খুবই স্বাভাবিক। নতুনত্ব আনার চেষ্টা করলেও কোনো না কোনো সিনেমার সঙ্গে মিলে যেতে পারে। মূলত এটা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের উপাদান। আমি কত সহজভাবে দশর্কের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি। কাজেই এটি কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃত ছিল না। সে ক্ষেত্রে যদি কারো সঙ্গে মিলে যায় তবে অবশ্যই তা কাকতালীয়।”

একই বছর মুক্তি পাওয়া বিজ্ঞাপন জগতের প্রথিতযশা নির্মাতা অমিতাভ রেজার ‘আয়নাবাজি’ ছবির পোস্টারের ক্ষেত্রেও উঠেছে নকলের অভিযোগ। দেখা গেছে ‘আয়নাবাজি’র পোস্টার হলিউড ছবি ‘হাউস অফ স্যান্ড অ্যান্ড ফগ’ ও ‘রাইজিং কেইন’ এবং তেলেগু ছবি ‘রাঘব’-এর পোস্টারের সঙ্গে মিলে গেছে।

এ ছাড়া মুক্তির প্রতীক্ষায় থাকা ফারুকী পরিচালিত ও ভারতের ইরফান খান অভিনীত বহুল আলোচিত ছবি ‘ডুব’র প্রথম প্রকাশিত পোস্টারও নকলের বাইরে নয়। হলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘রকি’ মোট পাঁচটি সিক্যুয়েলে মুক্তি পেয়েছে। ১৯৮৫ সালে নির্মিত এ ছবির চতুর্থ কিস্তি ‘রকি ফোর’-এর পোস্টারের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে ডুব ছবির পোস্টারে! তবে বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন না ডুবের নির্মাতা ফারুকী।

তিনি বলেছেন, ‘দুটো ছবির পোস্টার এক নয়। যারা দুটিকে এক করে দিচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’

এ ছাড়া সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ফাখরুল আরেফিন পরিচালিত অনুদানের ছবি ‘ভুবন মাঝি’র পোস্টারও দেখা গেছে বিদেশী ছবির পোস্টারের ছায়া অবলম্বনে তৈরি।

অন্যদিকে আগামীকাল মুক্তি প্রতিক্ষীত হিমেল আশরাফের ‘সুলতানা বিবিয়ানা’ পোস্টারেরও মিল পাওয়া যায় বলিউডের অজয় দেবগন ও টাবু অভিনীত ‘দৃশ্যম’ ছবির পোস্টারের সঙ্গে।

ঢাকাই চলচ্চিত্রে ক্যান্সারের মতো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া এ পোস্টার নকল বিষয়ে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংসের জন্য আর কী কী শুনতে হবে সেটার জন্যই যেন অপেক্ষায় আছে পুরো জাতি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s