বিষণ্ণতা একটি মানসিক রোগ

গতকাল ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- আসুন ডিপ্রেশন নিয়ে কথা বলি। ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা একটি গুরুতর মানসিক ব্যাধি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা যায়, ডিসএবিলিটি এডজাস্টেড লাইফ ইয়ার অনুযায়ী পৃথিবীতে সবচেয়ে কর্ম অক্ষম করা রোগের মধ্যে বর্তমানে বিষণ্ণতার অবস্থান তৃতীয়। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটির অবস্থান হবে দ্বিতীয়। আত্মহত্যার অন্যতম কারণ ডিপ্রেশন। বাংলাদেশেও ডিপ্রেশনের রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। কয়েক বছর আগের গবেষণায় এ হার ছিল ৪.৬ শতাংশ। বর্তমান গবেষণায় এটি প্রায় ১২ শতাংশ। দেশে প্রতিদিন প্রায় ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। বিষণ্ণতায় ভোগা বেশিরভাগ রোগী শারীরিক সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে হাজির হয় বলে রোগ সহজে শনাক্ত হয় না ও সঠিক চিকিৎসা পায় না। তাই ডিপ্রেশন নিয়ে আলোচনা জরুরি।

আমরা প্রাকটিসে প্রচুর বিষণ্ণতার রোগী পাই। তেমন দুটি রোগীর কাহিনী লিখছি যাতে পাঠক এ রোগের ধরণ, লক্ষণ ও করণীয় সম্পর্কে জানতে পারেন।

‘কষ্ট শুধু মনে থাকে না/এটি শরীরের কোষে কোষেও ঢুকে পড়ে’

আমরা মনে করি ডিপ্রেশন মানে রোগী এসে সরাসরি মনের কষ্ট, অশান্তির কথা বলবে। বেশিরভাগ ডিপ্রেশনের রোগীরা ডাক্তারের কাছে যায় শারীরিক সমস্যা নিয়ে। এ জন্য অনেক ডাক্তার প্রথম দিকে এটি যে মানসিক রোগ সেটি ধরতে পারেন না। প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় সবকিছু নরমাল দেখে আপনার কোনো রোগ নেই বলে স্যালাইন, ভিটামিন, ঘুমের ওষুধ রোগীকে দেন। রোগী এতে সুস্থ হয় না। আরও খারাপ হতে থাকে। এক পর্যায়ে রোগী বা তার আত্মীয়রা নিজেরাই বুঝে ব্রেইনের ডাক্তার-মানসিক রোগের ডাক্তার দেখাতে হবে ততদিনে রোগ অনেক অগ্রসর পর্যায়ে চলে গেছে। কোন কোন রোগী আত্মহত্যা করে বা অকর্মণ্য হয়ে পড়ে।

কাহিনী সংক্ষেপ : রোগিনী ওয়াহিদা, বয়স ৩০। বিয়ের পর স্বামী আরেকটি বিয়ে করে। তাদের তালাক হয়নি। একটি ছেলে আছে, সেও মার সঙ্গে থাকে। দিনে আনে দিন খায় অবস্থা। অনেকদিনের রোগ। অনেক চিকিৎসা করানো হয়েছে (অ্যালোপ্যাথি, কবিরাজি)। কিন্তু রোগের উপশম হয় না।

রোগীর ভাষায় সমস্যা : শরীর কাঁপে, মাংস লাফায়, চুলে বিড় বিড় করে, ঘুম কম, মাথা ঝাঁকুনি দেয়, হাত মোচড়ায়, গলায় কী যেন উঠে যায়, পেট মোড়া দেয়, জ্বর আছে, পায়খানা কষা, বালিশের সঙ্গে মাথা লাগাতে পারি না, বুক ব্যথা, শরীরে জ্বালা-পোড়া, রূহ বাইড়া-বাইড়ি করে, ক্ষিধা নেই, ঘুম নেই, রাতে আজেবাজে স্বপ্ন দেখে চিৎকার দিয়ে উঠি, বুক ধড়ফড় করে, পেট ভুর ভুর করে ডাকে- ইত্যাদি।

আরও কী সমস্যা জানতে চাইলে রোগী বলে : হাহুতাশ লাগে, কাজ করতে পারি না, জ্ঞান নেই, কিছু বুঝি না, কীভাবে কাজ করব তাও বুঝি না, ঘোরাঘুরির মধ্যে থাকি, আনন্দ লাগে না, এর কাছে ওর কাছে যাই কিন্তু কোথাও শান্তি পাই না, কি যেন হারিয়ে ফেলেছি, বেশি কথা বলি (আল্লাহ আল্লাহ বলি, অসুখ ভালো হবে না ইত্যাদি বলি)।

আমাদের যা শেখার রয়েছে

* ডিপ্রেশনের রোগীরা নানাবিধ শারীরিক লক্ষণ নিয়ে হাজির হতে পারে। মনের কথা, মনের ব্যথা শরীরের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।

* পরীক্ষায় কিছু পাওয়া যায়নি, তাই কোনো রোগ নেই এমনটি বলা অজ্ঞতার পরিচয়। সব ডাক্তারের মনে রাখতে হবে কোনো লক্ষণই তথাকথিত ভেইগ বা বানানো নয়। রোগের কারণ পাচ্ছেন না বা আপনার পড়া বিদ্যার সঙ্গে লক্ষণ মিলছে না তাই এটি রোগ নয় এমনটি ভাববেন না। মনোরোগ সমন্ধে প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে।

* দরিদ্রতা, পারিবারিক/দাম্পত্য সমস্যা ডিপ্রেশনের একটি বড় কারণ হতে পারে।

* আশার কথা ডিপ্রেশনের কার্যকর ও সফল চিকিৎসা রয়েছে।

‘ছেলে দুটিকে গলা কেটে মেরে নিজে মরতে চাই’

প্রায়ই পত্রিকায় খবর হয় যে মা নিজ সন্তানদের হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছে। আমরা বিস্মিত হই এমনটি কীভাবে সম্ভব? মা কি এত নিষ্ঠুর হতে পারে? কিন্তু সব হত্যা নিষ্ঠুরতা থেকে হয় তা নয়, কিছু হত্যা গভীর ভালোবাসা-মমতা ও করুণা থেকেও হতে পারে।

কাহিনী-১

৩০-৩২ বছরের নারী। দু’সন্তানের জননী। রোগের ইতিহাসও বেশি দিনের নয়, ৬ মাসের। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দন্দ্ব, সংঘাত বা মনোমালিন্যের তেমন কোনো ইতিহাস নেই। প্রথমবারের মতো চিকিৎসায় এসেছেন, তাও স্বামীর অনেক পীড়াপীড়ির পর। ইতিহাস ও মনস্বতাত্ত্বিক অবস্থা পরীক্ষা করে বুঝতে পারলাম তিনি গভীর বিষণ্ণতায় ভুগছেন।

রোগ কাহিনী বলতে গিয়ে তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। তিনি বলতে লাগলেন ওদেরকে (দু’ছেলে) গলা কেটে নিজে মরতে চাই কিন্তু সাহসে কুলায় না/(আমি প্রফেশনাল অভিজ্ঞতা থেকে জানতাম কেন মায়েরা আত্মহত্যার আগে সন্তানকেও হত্যা করে) তবুও তার বেলায় ব্যাখ্যাটি কী তা জানতে প্রশ্ন করলাম- এরা আপনার আপন সন্তান না? কীভাবে নিজ হাতে তাদের মারতে চান? কেন মারতে চান? তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন আমি না থাকলে এরা কেমনে বাঁচবে, এদের কষ্টের মধ্যে রেখে কীভাবে মরব? আমি জানতে চাইলাম, এদের মারলে এরা কষ্ট পাবে না? এটা সহ্য করবেন কীভাবে?

তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন- এরা তো কষ্টে থাকবে (তার মানে তিনি না থাকলে এরা কষ্টে থাকবে এ চিন্তাটিই বারবার বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে, অন্য বিষয়গুলো তেমন স্পষ্টভাবে অনুধাবনে আনতে পারছেন না)। উল্লেখ্য, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতেও তিনি আগ্রহী ছিলেন না। কী হবে ডাক্তার দেখিয়ে, এসব কথা কি বলা যায়- ইত্যাদি তাৎক্ষণিক কিছু কাউন্সিলিং করে ওষুধ দিয়ে ৩ দিন পর দেখা করতে বললাম (তারা হাসপাতালে ভর্তি হতে রাজি হচ্ছিলেন না)। সঙ্গে সুইসাইডাল সাবধানতা মানতে। ১৫ দিনের মাথায় রোগী অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠলেন।

এখন সন্তান হত্যার কথা মনে করিয়ে দিলে যারপরনাই লজ্জায় পড়ে যান এবং জীবনে কখনও এরকম কুচিন্তা মাথায় আনবেন না বলে জানান।

কাহিনী-২

৩ বছর আগের কথা- এক তরুণীকে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় চেম্বারে আনা হয়। সব জেনে, পরীক্ষা করে বুঝলাম একুউট সাইকোসিসে ভুগছে। কাহিনী সংক্ষেপ হল তার ইমেডিয়েট বড় ভাই মাদকাসক্ত ছিল। অনেক চিকিৎসায়ও তেমন উন্নতি হয়নি। সে বিভিন্ন অপরাধী গ্রুপের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। আর্থিক টানাটানি, পুলিশের হয়রানি, প্রতিপক্ষের হামলা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মানসিক অবসাদ সব মিলিয়ে তার ভাই বিষণ্ণতাসহ নানাবিধ মানসিক সমস্যায় ভুগত। তাকে সবাই ঘৃণা করত, এমনকি মা-বাবাও। তার একমাত্র সহকর্মী ও সঙ্গী ছিল এ ছোট বোনটি। সেই তাকে আগলিয়ে রাখার চেষ্টা করত কিন্তু বশে আনতে পারেনি। প্রায়ই সে বোনকে আত্মহত্যার কথা বলত, কিন্তু বোনটি তাকে সাহচর্য ও মমতা দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করত। তবে কোনো মনোচিকিৎসকের কাছে নেননি। একদিন রাতে ভাইটি খুবই অস্থির হয়ে উঠল।

বোনকে বারবার বলতে লাগল চল আমরা দু’জনে আত্মহত্যা করি, তুইও আমার সঙ্গে থাক। বোনটি অনেক কাকুতি মিনতি করে। কিন্তু তার অস্থিরতা কাটে না। অবশেষে সে প্রস্তাব দেয় চল বাইরে যাই, ঘুরলে হয়তো মন ভালো হবে।

তখন রাত ৩টা- ভাইয়ের শোচনীয় অবস্থা চিন্তা করে সে যেতে রাজি হয়। তাদের বাসা ছিল বুড়িগঙ্গা সেতু-২ এর কাছে।

এই গভীর, অন্ধকার রাতে দু’ভাই-বোন সবার অগোচরে বুড়িগঙ্গা সেতুতে পায়চারী করতে লাগল। বোনটি ভাইকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সে বলে তোকে আমি অনেক ভালোবাসি চল একসঙ্গে মরে যাই, কী হবে এ পৃথিবীতে বেঁচে থেকে। এভাবে মিনিট ১৫ হাঁটাহাঁটি করে তার ভাই একটি পিলারের খুব কাছে গিয়ে উঁকি মারে। পরক্ষণে সে ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়ে। একটি মাত্র ঝপাত শব্দ। বোনটি চিৎকার করতে করতে পাশের বাড়িতে ঢুকে পড়ে পাগলামী করতে থাকে। তারপর তো সব ইতিহাস (আত্মহত্যার আগে খুব কাছের জনকেও অনেকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়, এটি তার আরেকটি উপাখ্যান) আমি চাঁদপুরে শুক্রবারে চেম্বার করতে যাই। সেই সেতুর নিচ দিয়েই যেতে হয়। ঘটনাটি আমাকেও এতটুকু স্পর্শ করেছে যে প্রতিবার সেতুর কাছ দিয়ে গেলে সে বিভৎস্য স্মৃতির কথা মনে পরে (ডাক্তাররাও মানুষই তো)।

লেখক : মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s